শেরপুরের নকলা থেকে শুরু, মুক্তাগাছায় এসে শেষ। ১৪৭ দিনের দীর্ঘ পথচলায় সাইকেল চালিয়ে ঘুরেছেন বাংলাদেশের ৫০৩টি উপজেলা। পথে পথে তুলে ধরেছেন পরিবেশ রক্ষা, নারীশিক্ষা ও শিশুশ্রম বন্ধের বার্তা।
বাংলাদেশকে চেনার জন্য কেউ বেছে নেন বইয়ের পাতা, কেউবা মানচিত্র। আর মোহাম্মদ খায়রুল বেছে নিয়েছেন একটি বাইসাইকেল। সেই সাইকেলের চাকা ঘুরিয়ে তিনি পাড়ি দিয়েছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। শুধু ভ্রমণের আনন্দ কিংবা নতুন জায়গা দেখার নেশা নয়, তাঁর এই যাত্রার সঙ্গে যুক্ত ছিল পরিবেশবান্ধব সমাজ গঠনের স্বপ্ন এবং সামাজিক সচেতনতা তৈরির প্রত্যয় যা তরুণ প্রজন্মের মাঝে এখন দেখাই যায়না।
সাইকেলে বাংলাদেশের ৫০৩টি উপজেলা ভ্রমণ করে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এই তরুণ। তাঁর দাবি, তিনিই প্রথম বাংলাদেশি সাইকেল ভ্রমণকারী, যিনি দেশের ৫০৩টি উপজেলা বাইসাইকেলে পরিভ্রমণ করেছেন। এই ভ্রমণকে তিনি জাতীয় রেকর্ড হিসেবে দেখছেন।
গত ৯ জুন ২০২৬ সকাল ৮টায় শেরপুর জেলার নকলা উপজেলা থেকে শুরু হয় তাঁর স্বপ্নের যাত্রা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে গত ৩ নভেম্বর সকাল ১০টা ৪৩ মিনিটে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলায় এসে শেষ হয় সেই অভিযাত্রা। প্রায় পাঁচ মাসের এই যাত্রায় সাইকেলের প্যাডেল ঘুরেছে বাংলাদেশের ৫০৩টি উপজেলার পথে-প্রান্তরে।
ভ্রমণের সঙ্গে সচেতনতার বার্তা
মোহাম্মদ খায়রুল ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার শহীদ স্মৃতি সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি তাঁর আগ্রহ ভ্রমণ ও সমাজের নানা বিষয় নিয়ে কাজ করা। বাংলাদেশের ৫০০ উপজেলা সাইকেলে ভ্রমণের স্বপ্ন থেকেই শুরু হয়েছিল এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। পরবর্তী সময়ে সেই যাত্রা গড়িয়েছে ৫০৩ উপজেলায়। খায়রুলের কাছে এটি নিছক কোনো ভ্রমণ ছিল না। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল পরিবেশবান্ধব সমাজ গঠনে একটি সচেতনতামূলক পরিভ্রমণ। যাত্রাপথে বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁদের জীবনযাত্রা দেখেছেন এবং স্থানীয় তরুণদের সঙ্গে নানা সামাজিক বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
বিশেষ করে দুটি বিষয়কে তিনি আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছেন। প্রথমত, প্লাস্টিক দূষণ রোধ ও পরিবেশবান্ধব সমাজ গঠনে তরুণদের ভাবনা। দ্বিতীয়ত, নারীশিক্ষার প্রসার এবং শিশুশ্রম বন্ধে তরুণদের ভ‚মিকা ও সচেতনতা।
সাইকেল নিয়ে এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় যাওয়ার পাশাপাশি তিনি চেষ্টা করেছেন মানুষের মধ্যে এসব বিষয়ে চিন্তা ও আলোচনা ছড়িয়ে দিতে। তাঁর বিশ্বাস, সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে তরুণদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পথের অভিজ্ঞতায় আবিষ্কার করেছেন বাংলাদেশকে। এই দীর্ঘ ভ্রমণে খায়রুলের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি, ইতিহাস ও মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ। শহরের পরিচিত দৃশ্যের বাইরে তিনি দেখেছেন গ্রামীণ জনপদের সৌন্দর্য, মানুষের জীবনসংগ্রাম, ঐতিহাসিক স্থাপত্য এবং বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতির নানা রূপের সম্ভার।
উত্তরবঙ্গের মানুষের আতিথেয়তা তাঁকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। তাঁর অভিজ্ঞতায়, উত্তরবঙ্গের অনেক এলাকার মানুষ অতিথি দেখলে আন্তরিকভাবে খুশি হন। একজন অপরিচিত পথিককেও আপন করে নিতে তাঁদের আন্তরিকতার কমতি থাকে না। অতিথির সেবায় নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সবটুকু উজাড় করে দেওয়ার মানসিকতা তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।
অন্যদিকে নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী অঞ্চল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, সুনামগঞ্জ ও সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় দারিদ্রের চিত্র তাঁকে ভাবিয়েছে। এসব অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক বাস্তবতা দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন। তবে তাঁর চোখে এই জনপদগুলোর আরেকটি দিকও অসাধারণ। হাওর, বিস্তীর্ণ জলরাশি, গ্রামীণ জীবন ও প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য এসব এলাকাকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। খায়রুলের এই উপলব্ধি যেন বাংলাদেশের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। একদিকে মানুষের জীবনসংগ্রাম, অন্যদিকে প্রকৃতির অফুরন্ত সৌন্দর্য। একই দেশের ভেতর কত বৈচিত্র্য, কত ভিন্ন জীবনধারা, কত অজানা গল্প ছড়িয়ে আছে, সাইকেল ভ্রমণ তাঁকে সেই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করেছে।
স্বপ্ন থেকে বাস্তবতার পথে
একটি সাইকেল, অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর বাংলাদেশকে জানার প্রবল আগ্রহÑএই তিনের সমন্বয়ে খায়রুলের যাত্রা পূর্ণতা পেয়েছে। ৯ জুন ২০২৬ থেকে ৩ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত দীর্ঘ এই অভিযাত্রায় তিনি শুধু ৫০৩টি উপজেলা অতিক্রম করেননি; নিজের চোখে দেখেছেন দেশের মানুষের জীবন, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতা।
তাঁর এই উদ্যোগ তরুণদের জন্য একটি ভিন্ন বার্তা বহন করে। ভ্রমণ শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, চাইলে তা হতে পারে জ্ঞান অর্জন, মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমও।
বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলা ভ্রমণের এই অভিজ্ঞতা খায়রুলের ব্যক্তিগত স্বপ্নপূরণের পাশাপাশি দেশের বৈচিত্র্যকে নতুন করে জানার এক প্রয়াস। সাইকেলের প্রতিটি ঘূর্ণনে তিনি যেন খুঁজেছেন নিজের দেশকে, আর প্রতিটি জনপদে পৌঁছে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন সচেতনতার আলো।
একজন তরুণের এই দীর্ঘ পথচলা তাই কেবল সাইকেল চালিয়ে দূরত্ব অতিক্রমের গল্প নয়; এটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার, দেশকে কাছ থেকে জানার এবং সমাজের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতা প্রকাশের এক ব্যতিক্রমী উপাখ্যান।