যুদ্ধ, দমন-পীড়ন কিংবা শরণার্থী জীবনের যন্ত্রণা—এমনকি অনেক মানুষের অতীত হারিয়ে গেছে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় না-থাকার কারণে। সেই হারানো স্মৃতিই এখন ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
২০১৫ সালে ইউরোপে শরণার্থী সংকটের সময়, স্পেনের তরুণ স্বেচ্ছাসেবক পাও আলেইকুম গার্সিয়া গ্রিসের অ্যাথেন্স শহরে মানবিক সহায়তা দিচ্ছিলেন। একসময় তিনি এক বৃদ্ধা সিরীয় নারীর সঙ্গে দেখা করেন, যিনি বলেছিলেন, “আমি শরণার্থী হতে ভয় পাই না। আমি আমার জীবন কাটিয়ে ফেলেছি। আমি শুধু আমার নাতি-নাতনিদের জন্য চিন্তিত—তারা জানবেই না, কোথা থেকে এসেছে।”
পরিবারের সব ছবি হারিয়ে গেছে, স্মৃতি শুধু তার এবং তার স্বামীর মনে। গার্সিয়ার মনে গেঁথে যায় এই কথা।
পরবর্তীতে তিনি বার্সেলোনায় ফিরে গিয়ে তার প্রতিষ্ঠিত ডিজাইন স্টুডিও ‘ডমেস্টিক ডেটা স্ট্রিমার্স’-এর (DDS) মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান খুঁজতে শুরু করেন। ২০২২ সালে তারা শুরু করেন ‘সিনথেটিক মেমোরিজ’ নামের এক অভিনব প্রকল্প, যার মাধ্যমে এআই ব্যবহার করে তৈরি করা হয় মানুষের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির কৃত্রিম ছবি।
কেমন করে তৈরি হয় ‘সিনথেটিক মেমোরি’?
প্রথমে একজন ইন্টারভিউয়ার ব্যক্তির সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী কথোপকথনে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বা প্রথম স্মৃতি বেছে নেন। তারপর একজন প্রম্পটার সেই বিবরণ অনুযায়ী নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করে ছবি তৈরির জন্য এআই-এ নির্দেশনা দেন।
তৈরি হওয়া ছবিতে সাধারণত মুখাবয়ব অস্পষ্ট থাকে—এর মাধ্যমে বোঝানো হয়, এটি বাস্তব ছবি নয়, একটি কৃত্রিম পুনর্গঠন। ছবিগুলো অনেকটাই স্বপ্নময়, অস্পষ্ট—যেমনভাবে আমাদের স্মৃতিও ধূসর হয়ে আসে।
স্মৃতি ধরে রাখার অনুভূতি
এই প্রকল্পের অংশ নেওয়া অনেকেই বলেছেন, ছবিগুলো তাদের নিজস্ব স্মৃতির সঙ্গে একাত্ম করেছে। অতীতের ট্রমা, শৈশবের স্মৃতি কিংবা পরিবার হারানোর কষ্ট—সবই উঠে এসেছে কৃত্রিম ছবির মধ্যে।
বার্সেলোনায় একশ বছরের বেশি বয়সী পেপিতা প্রথমবার ট্রেন দেখার স্মৃতি এভাবেই নতুন করে দেখতে পেয়েছেন। স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় বাবাকে কারাগারে দেখতে যাওয়া কারমেনের স্মৃতিও ফিরে এসেছে কৃত্রিম ছবির মাধ্যমে।
সাবেক রাজনৈতিক বন্দি হোসে কার্লেস ভায়েজো ১৯৭০ সালে ফ্রাঙ্কোর স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গোপন বৈঠকে যোগ দেন। সেই বনভোজনের স্মৃতি, যা কখনো ক্যামেরাবন্দি হয়নি, এআই এখন তুলে ধরেছে।
ইতিহাস নয়, ব্যক্তি-স্মৃতি
গার্সিয়া ও তার দল জোর দিয়ে বলেন, তারা ইতিহাস রচনার চেষ্টা করছেন না। বরং, ব্যক্তির অনুভূতিময় স্মৃতিগুলো দৃশ্যায়নের মাধ্যমে মর্যাদা ও পরিচয়ের জায়গা তৈরি করছেন।
ভবিষ্যতের পথ
এখনো এই প্রযুক্তি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকলেও, ভবিষ্যতে নার্সিং হোম, স্মৃতিভ্রষ্ট রোগীদের থেরাপি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর স্মৃতি রক্ষায় এর ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
গার্সিয়া বলেন, “আগে মানুষের হয়তো ১০টা ছবি থাকত শৈশবে, এখন একটি শিশুর ২৫ হাজার ছবি আছে। কিন্তু সেগুলোর মধ্যে কোনটি আসল গল্প বলে, তা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।”
কিন্তু শরণার্থী বৃদ্ধার মতো মানুষদের জন্য, যাদের কাছে একটিও ছবি নেই, এক টুকরো ‘সিনথেটিক মেমোরি’ই হতে পারে অতীতের সবচেয়ে মূল্যবান দলিল।
“স্মৃতি ভুলে যাওয়ার নয়, বরং ভবিষ্যতের অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে,” বলেন সাবেক রাজনৈতিক বন্দি ভায়েজো। “ভুলে যাওয়ায় কিছুই আসে না। বরং স্মরণই বেশি আরামদায়ক—ব্যক্তিগতভাবেও, সামাজিকভাবেও।”
আল জাজিরা থেকে অনূদিত